সম্পর্কই যখন মানসিক চাপের কারণ
সম্পর্কই যেমন সমাজের মূল ভিত্তি এবং আমাদের মানসিক স্বস্তির কারণ, তেমনি অনেক সময় এই সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায় মানসিক অশান্তির মূল কারণ! দুশ্চিন্তা, হতাশা, বিষন্নতার মূল কারণগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, অধিকাংশের পিছনেই আছে বিভিন্ন সম্পর্কের মতভেদ এবং ভাঙ্গন - গড়নের গল্পের কাহিনী!
সম্পর্কের মানসিক চাপের কারণ হতে পারেন আপনি নিজে, আপনার পার্টনার, উভয়ই অথবা পারিপার্শ্বিকের প্রভাব।
প্রথমত, অধিকাংশ সম্পর্কের সমস্যাই আপনি নিজের কিছু বৈশিষ্ট্য বা ব্যক্তিত্বের কিছু জায়গা শুধরে নিলে ঠিক করা সম্ভব। যেমন, অল্পতে রেগে যাওয়া, যাচ্ছেতাই ব্যবহার বা গালিগালাজ করা, পার্টনারকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলা, অকারণে সন্দেহ করা, তার সবটুকু সময়ের উপর নিজের অধিকার চাওয়া, অবাস্তব চাহিদা রাখা ইত্যাদি একটি সম্পর্কের ধ্বংসের জন্য কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে! অধিকাংশই যেহেতু একজন ব্যক্তির নিজের সমস্যা, তাই এগুলো নিজে অথবা একজন প্রফেশনাল ব্যক্তির সাহায্য নিয়ে কাটিয়ে তোলার চেষ্টা করা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, হতে পারে সম্পর্কের মূল সমস্যাটির কারন আপনার পার্টনার। যেমন তার অতিরিক্ত রাগ, গালিগালাজ করা, পরকীয়ার সম্পর্ক, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের স্বভাব, মাদক বা পর্ন অ্যাডিকশন ইত্যাদি। এ সকল ক্ষেত্রে আপনাকে এসব দিক বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে যে - আপনি এই সম্পর্কে থাকবেন, নাকি এখান থেকে বের হয়ে আসবেন?
তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে সাধারণ যে ব্যাপারটি দেখা যায় তা হল সমস্যাটির মূলত উভয়েরই; অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর বোঝাপড়ার, ভালোবাসার ল্যাঙ্গুয়েজের পার্থক্যের, অথবা মতভেদ এবং কথা প্রকাশের ভাবভঙ্গিতে।এক্ষেত্রে তাদের চেষ্টা ও কাউন্সিলিং হল মূল হাতিয়ার।
চতুর্থত, হতে পারে আপনাদের দাম্পত্যের বোঝাপড়া খুবই ভালো, কিন্তু পারিপার্শ্বিক অথবা তৃতীয় পক্ষের কারো ইন্ধনে ফলে আপনাদের মাঝে সমস্যা বেড়েই চলছে। এক্ষেত্রে তার থেকে দূরত্ব, সমস্যা মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে।
সম্পর্ক না হোক অশান্তির কারণ, হোক মানসিক সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি।
মানসিক অশান্তিতে আপনার ভুল প্রত্যাশা-
- আকাঙ্ক্ষা করা ভুল নয়, তবে সবাই আমার চাহিদা পূরণ করবেই -এই আকাঙ্ক্ষা করা বোকামি।
- কারো মহানুভবতাকে কখনোই তার দায়িত্ব মনে করা উচিত নয়।
- আমি কি নিঃস্বার্থ? তাহলে, আমি কেন চাই,অন্য কেউ আমাকে তার ভাল চিন্তা না করেই যেকোন কিছু দিবে!?
- আমরা কেউই সম্পূর্ণ পারফেক্ট নই, তাহলে বাকিদের কাছ থেকেও পারফেকশনিসম আশা করা কি ঠিক?
- আমাদের অনুভূতির দায়ভার সম্পূর্ণ আমাদের নিজের, আমাদের মন খুশি রাখার দায়িত্ব বাকিদের নয়!
- আমরা সবাইকে সমান পছন্দ করি না, তাহলে এটা কি বাস্তব যে, সবাই আমাকে পছন্দ করবে?পছন্দ- অপছন্দ মিলেই জীবন।
- কেন আমরা সবকিছু নিজের মনমতো চাই? বা ইচ্ছামতো না হলেই রেগে যাই?
- যেমন আমরা কাওকে ভালবাসার পরেও আমাদের নিজস্ব বলে কিছু থাকতে পারে,একই ভাবে কারো ব্যক্তিগত বিষয় থাকার মানেও এই নয় যে, তার ভালবাসার কমতি আছে!
- ভাগ্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিজে চেষ্টা না করে, শুধু ভাগ্যের আশায় থাকা কতটুকু জাস্টিফাইড?
- সবশেষে মনে রাখা জরুরি, যা আমরা অন্যের থেকে চাই, তার কতটুকু আমরা নিজেরা পালন করি?
আমি কেন সুখি হতে পারছিনা?
- নিজের সুখকে নিজেই সংজ্ঞায়িত করুন। কারো কাছে আপনজন সুখ,কারো কাছে সাফল্য, আবার কারো কাছে অর্থ! আপনার জন্য সুখ কি?
- নিজের জীবনের প্রায়োরিটি লিস্ট রাখুন। সবসময় কিছু না পাওয়া থাকবেই,কিন্তু এই না পাওয়া আপনার লিস্টে সুখী হওয়ার জন্য কত নম্বরে?
- অন্তরের প্রশান্তিকে খুঁজে বেড়ান। খুব ছোট ছোট জিনিসে মন প্রশান্ত হতে পারে,সুখী হতে পারে,আবার অনেক বড় অর্জনের পরও না হতে পারে।
- সুখী থাকার সবচেয়ে মূল্যবান চাবিকাঠি হল- কৃতজ্ঞতাবোধ।
- আল্টিমেট সুখ লাভের জন্য আপনাকে অবশ্যই ত্যাগ স্বীকার করতে হবে,তাই কষ্টকে সুখের অংশ হিসাবে দেখুন।
- আপনার সুখ আপনার নিজের উপর নির্ভর করে,আপনার সাথে অন্য মানুষের আচরণের উপর নয়!
- সুখ বলতে কিছু নাই,সব মরীচিকা - এটা সত্য নয়।
- সুখ সন্তুষ্টির বাইপ্রোডাক্ট। তাই, নিজের জীবনে সন্তুষ্ট হতে শিখুন।
- আপনাকে নিজের চারপাশে সুখ খুঁজে নিতে হবে,সুখ আপনাকে খুঁজে নিবে না।
- মানুষের উপকার করুন। নিঃস্বার্থভাবে কিছু দেয়ায় একটা অদ্ভুত সুখ নিহিত আছে!
সন্দেহপ্রবনতা এড়িয়ে চলবেন কেন?
"তোমার ফেসবুকের পাসওয়ার্ডটা বলোতো।"
"এই, তুমি কার সাথে চ্যাট করছো?"
"তুমি কোথায় যাচ্ছ?"
"তুমি ওই ছেলেটার সাথে কথা বললে কেন?"
বলতে পারবেন, এই উক্তিগুলোর মাঝে কোনগুলো সতর্কতামূলক আর কোনগুলো সন্দেহের বহিঃপ্রকাশ? আমাদের জীবনের সম্পর্কগুলোর, বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনের সমস্যার কারণগুলোর মাঝে একটি মূল কারণ হলো - সাবধানতা এবং সন্দেহপ্রবণতা মাঝে পার্থক্য করতে না পারা। আমার অধিকারের সীমাবদ্ধতা কতটুকু, আর কখন আমার ইচ্ছাগুলো আমি অন্যের উপর চাপিয়ে দিচ্ছি, এটি বুঝতে না পারা সম্পর্ক নষ্টের জন্য যথেষ্ট!
মাথায় রাখা দরকার যে -
- সতর্কতার পিছনে যুক্তি থাকে, সন্দেহপ্রবণতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অযোক্তিক।
- সতর্কতা কারো পার্সোনাল স্পেস নষ্ট করে না, সন্দেহপ্রবণতা ব্যক্তি স্বাধীনতায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
- সতর্কতা সম্পর্ক সুন্দর করে, সন্দেহপ্রবণতা নষ্ট করে।
- সাধারণ সতর্কতা অন্যের কাছে খারাপ লাগে না, কিন্তু সন্দেহপ্রবণতা বিরক্তির উদ্রেক ঘটায়।
- সতর্কতা স্বাভাবিক, সন্দেহপ্রবণতা অস্বাভাবিক।
যেমন বাইরে যাওয়ার সময় আপনি আপনার প্রিয়জনকে প্রশ্ন করতেই পারেন, সে কোথায় যাচ্ছে; কিন্তু কখনোই সে কার সাথে মিশবে বা মিশবে না, এটি চাপিয়ে দিতে পারেন না। একইভাবে কেউ আপনার নিজস্বতাও নষ্ট করতে পারে না।
সম্পর্কে সাবধান থাকুন, সন্দেহপ্রবণ নয়!

0 Comments